Decade long Sudan ConflictSudan's flag.

Steven Pinker, তাঁর ২০১১ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ “The Better Angels of Our Nature: Why Violence Has Declined”-এ বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান ও তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করেছিলেন যে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে সামগ্রিক হিংসা ও সংঘাতের মাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ও যুদ্ধ-গবেষকদের অনেকেই অবশ্য এই তত্ত্বের সার্বজনীনতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সমাপ্তির পর সামগ্রিকভাবে বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘকাল ধরে সেই মাত্রার নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়নি।

কিন্তু সমকালীন বিশ্ব যেন এক নতুন হিংসাশ্রয়ী পর্বে প্রবেশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অবিরাম সংঘাত, আফ্রিকার আঞ্চলিক সংঘর্ষ, সাম্প্রতিক Russia-Ukraine যুদ্ধ কিংবা Israel-Gaza ও Iran-সংক্রান্ত উত্তেজনা সভ্যতার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তবে একটি বৈশ্বিক প্রবণতা স্পষ্ট—ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমত যতটা আলোড়িত হয়, আফ্রিকায় চলমান রক্তক্ষয়ী মানবিক ট্র্যাজেডিগুলোর ক্ষেত্রে সেই সংবেদনশীলতা অনেকটাই অনুপস্থিত থাকে।

আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য সেই উপেক্ষিত ট্র্যাজেডি—Sudan-এর অন্তহীন গৃহযুদ্ধের প্রতি বিশ্ববিবেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

সমসাময়িক যুদ্ধসমূহের হতাহতের তুলনামূলক পরিসংখ্যান

সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর হতাহতের তুলনামূলক পরিসংখ্যান

উপরোক্ত পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আধুনিক ইতিহাসে মানবনিধনের নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত হিসেবে Sudan আজ কোথায় দাঁড়িয়ে। যে কোনো বিবেকবান মানুষের কাছে সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই একমাত্র কাম্য। অথচ ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ, কাল্পনিক ভূ-রাজনীতি এবং সম্পদ দখলের লোভে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সামরিক শক্তি যে নির্বিচার গণহত্যাকে মদত দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তীব্র জনমত গড়ে ওঠা জরুরি।

Sudan-এর বর্তমান ভয়াবহতা বুঝতে গেলে একটু কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। ভাবুন, একদিন ভোরে ঘুম ভেঙে আপনি দেখলেন যে রাজপথগুলো দিয়ে একসময় স্কুলবাস চলত, পণ্যবাহী যান চলাচল করত, শিশুরা দল বেঁধে স্কুলে যেত—সেখানে আজ কেবলই পোড়া কংক্রিটের কঙ্কাল। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল কিংবা বহুতল আবাসিক ভবনগুলো আজ ধূসর ধ্বংসস্তূপ। কোনো জনমানব নেই; ফুটপাতে পড়ে রয়েছে গলিত মরদেহ আর কঙ্কাল। রাস্তায় হাঁটতে গেলে আপনার পায়ে হয়তো ধাক্কা লাগবে কোনো মানুষের বিচ্ছিন্ন মাথার খুলিতে। এটি কোনো রূপক নয়, Sudan-এর রাজধানী Khartoum এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় Darfur-এর প্রাত্যহিক বাস্তবতা।

ঐতিহাসিকভাবে বহুবার রক্তাক্ত হলেও Sudan-এর সাম্প্রতিকতম সর্বনাশা গৃহযুদ্ধটি শুরু হয় ১৫ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে। আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম এই দেশটি মূলত মুখোমুখি দাঁড়ায় দেশের দুটি সশস্ত্র প্রতিষ্ঠানের সংঘাতের মাঝে: একদিকে General Abdel Fattah al-Burhan-এর নেতৃত্বাধীন Sudanese Armed Forces (SAF), অন্যদিকে General Mohamed Hamdan Dagalo (Hemedti)-এর নেতৃত্বাধীন আধাসামরিক বাহিনী Rapid Support Forces (RSF)। নিছক ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক দড়ি-টানাটানি দিয়ে শুরু হলেও অতি দ্রুত তা সমগ্র দেশব্যাপী এক ভয়াবহ, কুৎসিত ও নৃশংস গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে বিষাদময় দিক হলো—এটি কোনো আদর্শিক বিপ্লব নয়, বাহ্যিক দুই রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়; বরং এটি দুই লোভী ও অহংকারী সেনাপতির ব্যক্তিগত আধিপত্য এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখলের লড়াই, যার মূল্য দিচ্ছে ৪ কোটি ৮০ লক্ষ নিরীহ সাধারণ মানুষ।

বিশেষ করে পশ্চিম Sudan-এর Darfur অঞ্চলে এই যুদ্ধ অতীতের সমস্ত বর্বরতাকে ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ নিজের ভিটেমাটি, সম্বল সব ফেলে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে। সেখানে RSF এবং তাদের সহযোগী মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে নির্বিচার ধর্ষণ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ (বিশেষ করে Masalit জনগোষ্ঠীর ওপর) এবং বলপূর্বক উচ্ছেদ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

উভয় পক্ষই—SAF এবং RSF—মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধে লিপ্ত। নির্বিচার বোমাবর্ষণ, ত্রাণপথ অবরোধ এবং খাদ্যগুদাম লুটের ফলে দেশটিতে সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ সহিংসতা, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে ইতোমধ্যেই প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ১ কোটি ২০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং আড়াই কোটি মানুষ তীব্র অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

Sudan-এর এই ট্র্যাজেডি অনুধাবন করতে হলে দেশটির ঔপনিবেশিক ও সামরিক ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন:

  • ঔপনিবেশিক বিভাজন ও প্রথম গৃহযুদ্ধ (১৯৫৫–১৯৭২): Anglo-Egyptian ঔপনিবেশিক শাসনামলে উত্তর ও দক্ষিণ Sudan-কে কার্যত দুটি পৃথক অঞ্চলে শাসন করা হয়। সমস্ত প্রশাসনিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও শিক্ষা কেন্দ্রীভূত রাখা হয়েছিল উত্তরের নদীকেন্দ্রিক আরব এলিটদের হাতে, আর দক্ষিণাঞ্চলকে রাখা হয়েছিল সম্পূর্ণ প্রান্তিক ও অনুন্নত করে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে সিভিল সার্ভিসের ৮০০ শূন্যপদের মধ্যে মাত্র ৮টি পদ দেওয়া হয় দক্ষিণের অধিবাসীদের। এই তীব্র বৈষম্যের জেরে ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে দক্ষিণাঞ্চলীয় সেনাদের Torit Mutiny ঘটে, যা স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বেই সুদানের প্রথম রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ডেকে আনে।
  • ইসলামিক অভ্যুত্থান ও দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ (১৯৮৩–২০০৫): ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Gaafar Nimeiry দক্ষিণের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে দেশজুড়ে শরিয়া আইন জারি করলে John Garang-এর নেতৃত্বে SPLA দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু করে। ১৯৮৯ সালে একটি কট্টরপন্থী ইসলামিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন ব্রিগেডিয়ার Omar al-Bashir। প্রায় তিন দশক ধরে স্বৈরশাসন চালান Bashir। তাঁর আমলেই ২০০৩ সালে Darfur-এর বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে তৎকালীন যাযাবর আরব মিলিশিয়া Janjaweed-কে লেলিয়ে দেওয়া হয়, যার ধারাবাহিকতা থেকেই আজকের Hemedti-র নেতৃত্বাধীন Rapid Support Forces (RSF)-এর জন্ম।
  • দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতা (২০১১): ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে ২০১১ সালে South Sudan স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়। এর ফলে Sudan তার খনিজ তেল রাজস্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ হারায়, যা পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলে এবং খনিজ সোনা দখলের হিংস্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেয়।
  • জনবিক্ষোভ, গণঅভ্যুত্থান ও বিশ্বাসঘাতকতা (২০১৯–২০২১): ২০১৯ সালে রুটি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনী ও RSF যৌথভাবে Omar al-Bashir-কে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরবর্তীতে গঠিত বেসামরিক-সামরিক যৌথ ট্র্যাঞ্জিশনাল সরকার গঠিত হলেও, ২০২১ সালের অক্টোবরে General Burhan এবং General Hemedti যৌথ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বেসামরিক নেতৃত্বকে ছুঁড়ে ফেলেন।
  • ২০২৩-এর বিস্ফোরণ: আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় যখন নিরাপত্তা খাত সংস্কারের অধীনে RSF-কে কত বছরের মধ্যে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে (SAF) অন্তর্ভুক্ত করা হবে—এই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখনই দুই জেনারেলের স্বার্থের সংঘাত রূপ নেয় সরাসরি যুদ্ধে।

El Fasher এবং Darfur-এর বিভিন্ন শহরে মানুষ যখন বোমা ও অনাহারে নিঃশেষ হচ্ছে, তখন প্রশ্ন জাগে—একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশে এত অস্ত্র ও অর্থ আসছে কোথা থেকে? উত্তর লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক স্বার্থান্বেষী শক্তিগুলোর নির্লজ্জ মদতে।

Darfur-এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র হলো সেখানকার নিয়ন্ত্রিত স্বর্ণের খনি (যেমন Jebel Amer)। Rapid Support Forces (RSF)-কে অর্থ, লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত অস্ত্র সাহায্য জুগিয়ে আসছে United Arab Emirates (UAE), যারা পূর্ব শাদের Amdjarass বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে এবং চোরাই সোনার বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এছাড়া লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের সেনাপতি Khalifa Haftar মরুভূমির রুট দিয়ে RSF-কে জ্বালানি ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে চলেছে। পাশাপাশি রাশিয়ার Wagner Group শুরু থেকেই খনিজ সোনার সুবিধা নেওয়ার জন্য তাদের অস্ত্র ও ট্যাকটিক্যাল সহযোগিতা দিয়েছে।

বিপরীত দিকে, রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী Sudanese Armed Forces (SAF) পাশে পেয়েছে Egypt-কে, যারা তাদের দীর্ঘ সীমান্ত নিরাপত্তা ও নীল নদের জলবণ্টন (GERD) সুরক্ষার স্বার্থে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। SAF-এর সমর্থনে যুক্ত হয়েছে Iran, যাদের সরবরাহকৃত শক্তিশালী কমব্যাট ড্রোন (Mohajer-6 ইত্যাদি) যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি প্রভাবিত করেছে। এমনকি Russia-ও Port Sudan-এ লোহিত সাগরে নৌঘাঁটি স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বাহিনীর সাথে আনুষ্ঠানিক সামরিক সমঝোতা বৃদ্ধি করেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির অবৈধ ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বহুমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ দখল এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত উপকূলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই প্রতিযোগিতা সুদানের নিরীহ মানুষের জীবনকে বলিদান করছে। Sudan-এর এই কান্না শুধু একটি গৃহযুদ্ধ নয়, মানবতার বিবেক ও আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার চরম পরাজয়।

বৈদেশিক মদত ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সারণী (Infographic Table)

নিচে উভয় পক্ষের বহিরাগত মদতদাতাদের বিবরণ সংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল সারণী তৈরি করা হয়েছে:

Foreign Backers of Sudan Conflict

By Swarup Bhattacharya

I’m a fast-aging dreamer, finding my peace and passion on the road. Specifically, I love to go around by meandering roads in my wife’s old car—a simple joy constantly challenged by the rising cost of petrol. This necessity keeps me with a close watch on geopolitics and macroeconomics, tying my personal challenge to the world’s stage.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *